ভাদ্র মাসের সংক্রান্তি মানেই দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনা। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বিশ্বকর্মা হলেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ঐশ্বরিক স্থপতি ও কারিগর। তাই ভাদ্র মাসের শেষ দিনে দেশজুড়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় বিশ্বকর্মা পূজা বা বিশ্বকর্মা জয়ন্তী। প্রতি বছরের মতো এবছরও শুক্রবার রাজ্যজুড়ে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পূজিত হন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। তবে বিশ্বকর্মা পূজার সঙ্গে এক ভিন্ন ঐতিহ্যের ছবি দেখা গেল আগরতলার আর কে নগরস্থিত টিএসআর দ্বিতীয় ব্যাটেলিয়ানের ক্যাম্পে। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনার পাশাপাশি এদিন সেখানে আয়োজন করা হয় অস্ত্র পূজার। ঘটা করে বিশ্বকর্মা পূজা এবং অস্ত্র পূজাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পজুড়ে ছিল উৎসবের আবহ। এবছর টিএসআর দ্বিতীয় ব্যাটেলিয়ানের বিশ্বকর্মা পূজা ও অস্ত্র পূজা ৩৫তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য এবারও যথাযথ ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে পালন করা হয়। একই মণ্ডপে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার পাশাপাশি বাহিনীর ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্রও সাজিয়ে রাখা হয় পূজার জন্য। বিশ্বকর্মা পূজাকে মূলত কারিগর, প্রকৌশলী, শ্রমিক এবং বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কর্ম ও সরঞ্জামের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হিসেবে দেখা হয়। কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের সুরক্ষা এবং সেগুলির সঠিক ব্যবহারের জন্য বিশ্বকর্মার আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন মানুষ। সেই বিশ্বাস থেকেই টিএসআর দ্বিতীয় ব্যাটেলিয়ানের জওয়ানরাও নিজেদের কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত অস্ত্রের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার জন্য বিশ্বকর্মার কাছে প্রার্থনা করেন।
এদিন ক্যাম্পের এক আধিকারিক জানান, বিশ্বকর্মা পূজার সঙ্গে অস্ত্র পূজার এই আয়োজন দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। বাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রগুলি যেন প্রয়োজনের সময়ে সঠিকভাবে এবং সঠিক উদ্দেশ্যে কাজ করে, সেই প্রার্থনাই করা হয় বিশ্বকর্মার কাছে। একইসঙ্গে অস্ত্রের প্রতি দায়িত্বশীলতা ও শ্রদ্ধার বিষয়টিও এই পূজার মাধ্যমে স্মরণ করা হয়। সাধারণত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নবরাত্রির নবম দিনে অস্ত্র ও সরঞ্জাম পূজার প্রচলন রয়েছে। অনেক জায়গায় এই পূজাকে ‘আয়ুধা পূজা’ নামেও অভিহিত করা হয়। ওই দিনে মানুষ নিজেদের পেশাগত কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম থেকে শুরু করে অস্ত্র পর্যন্ত পূজা করে থাকেন। হিন্দু পুরাণেও অস্ত্র পূজার সঙ্গে দেবী দুর্গার যুদ্ধের প্রসঙ্গ জড়িয়ে রয়েছে। পুরাণ অনুসারে, মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধে দেবী দুর্গাকে বিভিন্ন দেবতা বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র প্রদান করেছিলেন। পরবর্তীকালে সেই ঐতিহ্য থেকেই অস্ত্র পূজার প্রচলন হয়েছে বলে ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে। তবে ত্রিপুরায় টিএসআর দ্বিতীয় ব্যাটেলিয়ানের ক্যাম্পে এই অস্ত্র পূজা নবরাত্রির নবম দিনে নয়, বিশ্বকর্মা পূজার দিনই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বিশ্বকর্মা পূজা এবং অস্ত্র পূজার এই বিশেষ সমন্বয় দীর্ঘদিন ধরে বাহিনীর মধ্যে একটি স্বতন্ত্র ঐতিহ্য হিসেবে চলে আসছে। এদিন পূজাকে ঘিরে টিএসআর দ্বিতীয় ব্যাটেলিয়ানের আধিকারিক থেকে শুরু করে জওয়ানদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বাহিনীর কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত অস্ত্র ও সরঞ্জামের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং শ্রদ্ধার প্রতিফলনও দেখা যায় এই আয়োজনে। সব মিলিয়ে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনার সঙ্গে টিএসআর জওয়ানদের অস্ত্র পূজার এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন রাজ্যের বিশ্বকর্মা পূজার উদযাপনে যোগ করেছে এক ভিন্ন মাত্রা।



