আগরতলা শহরতলির যোগেন্দ্রনগর এলাকায় বিরোধী দলের এক সমর্থকের পুকুরে রাতের অন্ধকারে বিষ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। দুষ্কৃতিকারীদের এই কর্মকাণ্ডে পুকুরের সমস্ত মাছ মরে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৎস্যচাষি পরমেশ্বর দাস। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক লক্ষ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যোগেন্দ্রনগর এলাকার বাসিন্দা এবং সিপিআইএম কর্মী পরমেশ্বর দাস দীর্ঘদিন ধরে নিজের বাড়ির পুকুরে মাছ চাষ করে আসছিলেন। বুধবার গভীর রাতে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতিকারীরা পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে বলে অভিযোগ। বিষয়টি প্রথমে নজরে আসে বৃহস্পতিবার সকালে। পুকুরে গিয়ে দেখা যায়, জলের উপর অসংখ্য মাছ ভেসে উঠেছে। কিছু মাছ ইতিমধ্যেই মরে গিয়েছে, আবার কিছু মাছ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয় বাসিন্দারা পুকুরের পাশে ভিড় করেন। মৎস্যচাষি পরমেশ্বর দাস জানান, পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছিল। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও বিনিয়োগের পর মাছগুলি বিক্রির উপযোগী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু রাতের অন্ধকারে বিষ প্রয়োগের ফলে মুহূর্তের মধ্যে তাঁর সমস্ত পরিশ্রম নষ্ট হয়ে যায়। এই ঘটনায় তিনি কয়েক লক্ষ টাকা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন বলে জানান। পরমেশ্বর দাসের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধের জেরেই পরিকল্পিতভাবে তাঁর পুকুরে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এর আগে তাঁকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে রাতের অন্ধকারে এভাবে পুকুরে বিষ ঢেলে মাছ নষ্ট করে দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
ঘটনার খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর পরিদর্শনে যান রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তথা সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক জিতেন্দ্র চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কৃষকসভার সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি হান্নান মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক বিজু কৃষ্ণান, রাজ্য সম্পাদক রতন দাস, তপশিলি জাতি সমন্বয় সমিতির রাজ্য সম্পাদক সুদন দাসসহ স্থানীয় নেতৃত্বরা। নেতৃবৃন্দ প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত পুকুরটি ঘুরে দেখেন। তাঁরা পুকুরের জলে ভেসে থাকা মৃত মাছ এবং ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রত্যক্ষ করেন। পরে মৎস্যচাষি পরমেশ্বর দাস ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চান। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি তাঁরা ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান।
পরিদর্শন শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যে বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকদের উপর ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ চালানো হচ্ছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে সাধারণ মানুষের জীবিকা ও সম্পত্তিকে নিশানা করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।জিতেন্দ্র চৌধুরী বলেন, “এই রাজ্যে এখন বর্বর রাজত্ব চলছে। বিরোধী দলের সমর্থকদের উপর নানা ধরনের আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে। মানুষের জীবিকা ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে, অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।” তিনি আরও বলেন, “হিটলারের পতনের আগে যেভাবে জনগণের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছিল, ঠিক একই কায়দায় আরএসএস ও ভারতীয় জনতা পার্টি মানুষের উপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সুশাসনের ছবি এটাই। তবে মনে রাখতে হবে, এটি তাদের শেষের শুরু।” বিরোধী দলনেতার অভিযোগ, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মৎস্যচাষ, কৃষিকাজ কিংবা ছোট ব্যবসার মতো জীবিকার ক্ষেত্রগুলিও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বাইরে থাকছে না। এই ধরনের ঘটনায় প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সিপিআইএম নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দুষ্কৃতিকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি এলাকায় রাজনৈতিক সন্ত্রাস বন্ধ করে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দারাও ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও কারও জীবিকা ধ্বংস করে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। পুকুরে বিষ প্রয়োগের মতো ঘটনা শুধু একজন মৎস্যচাষির ক্ষতি নয়, এলাকার শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা থাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের হয়েছে কি না এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তদন্তের পরই ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং অভিযুক্তদের পরিচয় সামনে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।



