Saturday, October 10, 2026
বাড়িখবররাজ্যমহালয়ায় পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ, ঐতিহ্য ও আবেগে ভাসল আগরতলা

মহালয়ায় পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ, ঐতিহ্য ও আবেগে ভাসল আগরতলা

দেবীপক্ষের সূচনালগ্নে পিতৃপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় তর্পণ করলেন অসংখ্য মানুষ। মহালয়ার পবিত্র তিথিতে শনিবার ভোর থেকেই আগরতলার ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্মীনারায়ণ বাড়ির দিঘি, রাজবাড়ির দিঘি-সহ শহরের বিভিন্ন জলাশয় ও ঘাটে ভিড় জমান সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে জল ও তিল অর্পণ করে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তাঁরা। তর্পণকে ঘিরে এদিন বিভিন্ন ঘাটে তৈরি হয় এক বিশেষ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ। সনাতন ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার হলো মহালয়ার দিনে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ। ‘তর্পণ’ শব্দের অর্থ তৃপ্ত করা। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জল ও তিল নিবেদনের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা হয় এবং তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। মানবজীবনের সঙ্গে পূর্বপুরুষদের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এই প্রাচীন ঐতিহ্য। প্রচলিত রীতি অনুসারে, মহালয়ার সকালে পবিত্র নদী, দিঘি কিংবা জলাশয়ে স্নান সেরে তর্পণ করেন অনেকে। নিজের পূর্বপুরুষদের পাশাপাশি পরিচিত-অপরিচিত এবং অতৃপ্ত আত্মার শান্তি কামনাতেও জল নিবেদনের প্রথা রয়েছে। সেই বিশ্বাস ও ধর্মীয় রীতিকে সামনে রেখেই এদিন ভোর থেকে আগরতলার বিভিন্ন ঘাটে শুরু হয় তর্পণ। হিন্দু ধর্মীয় পঞ্জিকা অনুসারে, পিতৃপক্ষের অবসানের পর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। পিতৃপক্ষের সময় পূর্বপুরুষদের স্মরণে তর্পণ, পিণ্ডদান ও শ্রাদ্ধের মতো আচার পালন করা হয়। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত জল ও অন্যান্য উপাচার তাঁদের তৃপ্তি ও শান্তির প্রতীক।

মহালয়ার সঙ্গে বাঙালির আবেগের সম্পর্ক অবশ্য শুধুমাত্র ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ নয়। ভোরবেলায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার মধ্য দিয়েই বহু বাঙালির কাছে শারদোৎসবের আনুষ্ঠানিক আবহ শুরু হয়। একদিকে পিতৃপুরুষকে বিদায় জানানোর আবেগ, অন্যদিকে দেবী দুর্গার আগমনীর সুর—এই দুই অনুভূতির মেলবন্ধন মহালয়ার সকালকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়। শনিবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না। ভোর থেকেই লক্ষ্মীনারায়ণ বাড়ি ও রাজবাড়ির দিঘি-সহ বিভিন্ন ঘাটে মানুষের সমাগম দেখা যায়। কেউ পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের স্মরণে তর্পণ করেন, আবার কেউ পুরোহিতের নির্দেশে ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করেন। ঘাটে ঘাটে মন্ত্রোচ্চারণ ও জল নিবেদনের দৃশ্য মহালয়ার চিরাচরিত ঐতিহ্যকে আরও একবার সামনে নিয়ে আসে। ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি শহরজুড়ে ছিল উৎসবের আবহও। শিশু থেকে প্রবীণ—সকলের মধ্যেই শারদোৎসবকে ঘিরে দেখা যায় উৎসাহ ও আনন্দ। দেবী দুর্গার আগমনের অপেক্ষায় যখন প্রস্তুতি চলছে বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে, তখন মহালয়ার তর্পণ বাঙালিকে স্মরণ করিয়ে দেয় শিকড়, পারিবারিক বন্ধন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহমান ঐতিহ্যের কথা। সব মিলিয়ে মহালয়া আগরতলায় একদিকে পিতৃপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা নিবেদনের দিন, অন্যদিকে দুর্গাপুজোর আগমনী বার্তায় আবেগে ভেসে ওঠার মুহূর্ত। ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক স্মৃতি ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এই মেলবন্ধনেই মহালয়ার সকাল হয়ে ওঠে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

6 − six =

- Advertisment -spot_img

জনপ্রিয় খবর

সাম্প্রতিক মন্তব্য