খোয়াই প্রতিনিধি ২৫ শে জুলাই…..আবারও রাজ্যের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পরিষেবাকে কলঙ্কিত করলো খোয়াই জেলা হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এক চিকিৎসক। এক দরিদ্র দিনমজুর শ্রমিকের স্ত্রীকে সিজারিয়ান পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তান প্রসব করিয়ে গর্ভধারিনীকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেবার অভিযোগ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে তাতে তীব্র চাঞ্চল ছড়িয়ে পড়ল খোয়াই জেলা হাসপাতালে। চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি মৃত রোগীকে খোয়াই জেলা হাসপাতাল থেকে জিবি হাসপাতালে রেফার করেন।
রাজধানী আগরতলায় সরকারি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে রাজ্য সরকার যতটা তৎপরতার সঙ্গে কাজ করছে ঠিক তার উল্টো চিত্র রাজ্যের জেলা হাসপাতাল গুলোতে। প্রতিদিন রাজ্যের প্রধান হাসপাতালটিকে আধুনিকরণের চেষ্টা চালাচ্ছে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর। আর অন্যদিকে জেলা হাসপাতালগুলোতে কর্মরত চিকিৎসকদের খামখেয়ালিপনার কারণে অকালে রোগীদের প্রাণ যাচ্ছে। সম্প্রতি খোয়াই জেলা হাসপাতালে সিজার করতে গিয়ে চিকিৎসকের হাতে অকালে প্রাণ গেল এক প্রসূতি মায়ের। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃত রোগীকে অক্সিজেন লাগিয়ে রেফার করে দেন জিবি হাসপাতালে।
যে প্রসূতি মায়ের অকালে মৃত্যু হলো তার নাম সম্পৃকা দেববর্মা (২৩) স্বামী বিশ্বজিত দেববর্মা। তার বাড়ি প্রেম সিং উরাং এডিসি ভিলেজের গোবিন্দ সেনাপতি পাড়ায়। এলাকাটি কল্যাণপুর বিধানসভার অন্তর্গত। মৃত প্রসূতি মায়ের স্বামী বিশ্বজিৎ দেববর্মা অভিযোগ করে জানান, খোয়াই জেলা হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অমূল্য দেববর্মা ওনার স্ত্রীর গর্ভধারণের পর চিকিৎসা করে আসছিলেন। গত ১৭ জুলাই তিনি স্ত্রীকে সন্তান প্রসবের জন্য খোয়াই জেলা হাসপাতালে ভর্তি করান। ২১ জুলাই সন্ধ্যে ৬ টায় ওই চিকিৎসক ওনার স্ত্রীকে সিজার পদ্ধতির মাধ্যমে একটি কন্যা সন্তান প্রসব করান। প্রসবের পর থেকেই প্রসূতি মায়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছিল না। এ বিষয়টি চিকিৎসকরা চেপে যান। সময় যত গড়াতে থাকে ততই প্রসূতি মায়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে। ২২ জুলাই খুব ভোরে ওই প্রসূতি মায়ের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর হাসপাতালের চিকিৎসকরা স্বামী বিশ্বজিত দেববর্মাকে ডেকে এনে জানিয়ে দেন স্ত্রীকে বাঁচাতে হলে এক্ষুনি জিবিতে নিয়ে যেতে হবে। ওই কথা শোনার পর স্বামী বিশ্বজিত দেববর্মা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে তার স্ত্রীকে দেখার জন্য অনুমতি চাইলে কর্মরত নার্সরা উনাকে স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেননি বলে অভিযোগ। বিশ্বজিৎ দেববর্মা জানান ২২ জুলাই ভোর ছয়টায় ১০২ নং অ্যাম্বুলেন্স করে উনার মৃত স্ত্রী সহ শিশুকন্যাটিকে জিবি হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। গাড়িতে তোলার পর তিনি দেখতে পান স্ত্রীর মুখ দিয়ে রক্তসহ ফেনা বেরিয়ে শুকিয়ে আছে। তিনি মরে কাঠ হয়ে রয়েছেন। ওইদিন সকাল সাড়ে সাতটায় জিবি হাসপাতালে পৌঁছার পর চিকিৎসকরা উনাকে জানিয়ে দেন উনার স্ত্রী আর বেঁচে নেই। পরে মৃতদেহ ময়না তদন্তের পর বিশ্বজিত দেববর্মার হাতে তুলে দেয় জিবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ২২ জুলাই বিকেলে মৃতদেহটি বিশ্বজিত দেববর্মার শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তার শেষ কাজ করা হয়। এদিকে মৃত গৃহবধূর স্বামী বিশ্বজিত দেববর্মা জানান তিনি একজন শ্রমিক। বৃদ্ধ মাতা পিতাকে বহু কষ্ট করে লালন-পালন করছিলেন। বর্তমানে দু’দিনের শিশু কন্যাটিকে কিভাবে বাঁচিয়ে রাখবেন তা তিনি ভেবে উঠতে পারছেন না। তিনি জানান দুই আড়াই বছর পূর্বে তিনি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন সম্পৃকাকে। স্ত্রীকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন স্বামী বিশ্বজিত দেববর্মা। তিনি এই ঘটনার জন্য খোয়াই জেলা হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অমূল্য দেববর্মাকে দায়ী করছেন। এদিকে ২২ জুলাই দুপুরে জিবি হাসপাতাল থেকে ময়নাতদন্তের পর ওই গৃহবধূর মৃতদেহ তার পরিবারের হাতে তুলে দেবার খবর পেয়ে শ্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অমূল্য দেববর্মা হঠাৎ ছুটি নিয়ে আগরতলায় চলে যান। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অমূল্য দেববর্মাকে ঘটনার পর থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তিনি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। সোমবার সন্ধ্যায় ওই চিকিৎসক উনার সরকারি আবাসনে আসার সংবাদ পেয়ে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের কর্মীরা উনার প্রতিক্রিয়া জানার জন্য মোবাইলে যোগাযোগ করেন। চিকিৎসক সংবাদ মাধ্যমের কর্মীদের সরকারি আবাসনে আসার জন্য বললে যথারীতি সাংবাদিকরা উনার কোয়াটারের সামনে যান। চিকিৎসক অমূল্য দেববর্মার কোয়ার্টারে ওই সময় মদমও অবস্থায় ছিলেন অপর চিকিৎসক জন দেববর্মা। তিনি সাংবাদিকদের দেখেই অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে শুরু করেন এমনকি তিনি সংবাদ মাধ্যমের কর্মীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। পরবর্তী সময়ে সংবাদ মাধ্যমের কর্মীরা বিষয়টি জানান জেলা স্বাস্থ্য মুখ্য আধিকারিক নির্মল সরকারের কাছে। পরে চিকিৎসক অমূল্য দেববর্মা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপে পড়ে মঙ্গলবার দুপুরে সংবাদ মাধ্যমের সামনে আসেন।এদিকে দিনমজুর শ্রমিক বিশ্বজিত দেববর্মা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি জানান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে যেন তদন্ত করেন। উল্লেখ্য বহুদিন ধরেই খোয়াই জেলা হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অমূল্য দেববর্মার বিরুদ্ধে চিকিৎসায় গাফিলতির বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠে আসছে। সরকারি হাসপাতালের সিজার মেশিন ব্যবহার করে তিনি সাধারণ রোগীদের পরিষেবা দেবার বিনিময়ে রোগীর আত্মীয় নিকট থেকে অর্থ নিচ্ছেন বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। মৃত রোগীকে অক্সিজেন লাগিয়ে জিবিতে পাঠানো, চিকিৎসায় গাফিলতি, অবৈধভাবে জেলা হাসপাতালের ভেতর ভ্রুণ হত্যা, ইত্যাদি একাধিক অপকর্ম তিনি চালিয়ে আসছিলেন মেডিকেল সুপার রাজেশ দেববর্মার পরোক্ষ মদতে।



