হিন্দু বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব বিশ্বকর্মা পূজা। বাংলা ক্যালেন্ডারের ভাদ্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ সংক্রান্তিতে প্রতি বছরই দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনায় মেতে ওঠেন মানুষ। শিল্প কারখানা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, মোটর স্ট্যান্ড, যানবাহন মালিকদের সংগঠন এমনকি বহু বাড়িতেও অত্যন্ত ধর্মীয় নিষ্ঠা ও আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয় এই পূজা। তিথি অনুযায়ী এবছর শুক্রবার রাজ্যজুড়ে পালিত হবে বিশ্বকর্মা পূজা। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে মহাবিশ্বের প্রথম ইঞ্জিনিয়ার, স্থাপত্যবিদ এবং সমস্ত শিল্প ও কারিগরি কাজের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা হিসেবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পুজো করে থাকেন। কর্মক্ষেত্রে সাফল্য, কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি, যন্ত্রপাতির সুরক্ষা এবং ব্যবসায়িক সমৃদ্ধির কামনায় প্রতিবছর ভাদ্র সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মা পূজার আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বিশ্বকর্মা হলেন সৃষ্টির দেবতা। কর্মজীবনে কাজের নিখুঁততা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধির জন্য তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন ভক্তরা। পাশাপাশি ব্যবসায়িক উন্নতি, আর্থিক সমৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রে সাফল্য লাভও এই পূজার অন্যতম উদ্দেশ্য। সেই বিশ্বাস ও প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই এবারও দেবশিল্পীর আরাধনায় ব্রতী হতে চলেছেন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ।
আর বিশ্বকর্মা পূজাকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই জমে উঠেছে রাজ্যের বিভিন্ন বাজার। পূজার প্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে শুরু করে ফল, ফুল এবং অন্যান্য উপকরণ কিনতে বাজারে ভিড় করছেন সাধারণ মানুষ ও পুজোর উদ্যোক্তারা। শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় বাজারের ব্যস্ততাও বাড়ছে ক্রমশ। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবছর পূজার সামগ্রী ও ফলমূলের দাম অনেকটাই বেশি বলে জানাচ্ছেন ক্রেতারা। ফলে সীমিত বাজেটের মধ্যে পূজার আয়োজন করতে গিয়ে অনেক উদ্যোক্তাকেই বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। পুজোর খরচ সামলাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। শুধু পুজোর সামগ্রীই নয়, বিশ্বকর্মার মূর্তির দামও এবছর বেড়েছে বলে জানা যাচ্ছে। মূর্তি তৈরির প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের দাম একলাফে অনেকটা বৃদ্ধি পাওয়ায় তার প্রভাব পড়েছে প্রতিমার দামের উপরও। বাজারে বিভিন্ন মাপের বিশ্বকর্মা প্রতিমা নিয়ে হাজির হয়েছেন মৃৎশিল্পীরা। ছোট থেকে বড়—বিভিন্ন ধরনের মূর্তি সাজিয়ে ক্রেতাদের অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা। তবে প্রতিমা বিক্রি নিয়ে কিছুটা সংশয়ও রয়েছে মৃৎশিল্পীদের মধ্যে। বাড়তি খরচ এবং বাজারদরের কারণে ক্রেতারা কতটা আগ্রহ দেখাবেন, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে রয়েছে অনিশ্চয়তা। এরপরেও একরাশ প্রত্যাশা নিয়ে ক্রেতাদের অপেক্ষায় রয়েছেন শিল্পীরা। পুজোর শেষ মুহূর্তে বিক্রি বাড়বে বলেই আশাবাদী তাঁরা। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপ থাকলেও দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনায় কোনো রকম খামতি রাখতে নারাজ পুজোর আয়োজকরা। ধর্মীয় বিশ্বাস ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে সামনে রেখে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পুজোর সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ করার প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। সব মিলিয়ে একদিকে বাড়তি দামের চাপ, অন্যদিকে উৎসবের আমেজ—দুইয়ের মিশেলেই ক্রমশ জমজমাট হয়ে উঠছে বিশ্বকর্মা পূজার বাজার। শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা ও প্রস্তুতিতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তেই এখন বিরাজ করছে উৎসবের আবহ। শুক্রবার দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনার মধ্য দিয়ে সেই উৎসবের রঙ আরও গাঢ় হয়ে উঠবে।



