রাজ্যের বিভিন্ন জনস্বার্থমূলক দাবি এবং কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন নীতির প্রতিবাদে বামপন্থী শ্রমিক, কৃষক ও গণসংগঠনগুলির ডাকা জেল ভরো আন্দোলন কর্মসূচিকে ঘিরে সোমবার তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিল ত্রিপুরায়। সারা দেশের সঙ্গে রাজ্যেও বিভিন্ন জেলা ও মহকুমায় এই কর্মসূচি পালন করা হয়। আন্দোলনে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে দাবি করেছে বাম নেতৃত্ব। কর্মসূচি শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সিটু রাজ্য সাধারণ সম্পাদক শংকর প্রসাদ দত্ত জানান, রাজ্যের আটটি জেলার প্রায় ২০টি জায়গায় হাজার হাজার মানুষ এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তাঁর দাবি, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সংবিধান ও গণতন্ত্র আক্রান্ত এবং জনজীবন বিপন্ন—এই অভিযোগ তুলে মানুষ প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন বলে জানান তিনি।
এদিনের কর্মসূচিতে সিটুর রাজ্য কমিটির সম্পাদক সমর চক্রবর্তী আহত হন বলেও জানান শংকর প্রসাদ দত্ত। তাঁর হাতে আঘাত লেগেছে এবং তাঁর অস্ত্রোপচার করা হবে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক ছাত্রী পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন এবং বর্তমানে হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছে বলেও জানান সিটু নেতা। তাঁর বক্তব্য, সরকার যদি এই আন্দোলন থেকে শিক্ষা না নেয়, তাহলে আগামী দিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। সারা ভারত কৃষক সভার রাজ্য সম্পাদক পবিত্র কর বলেন, এদিনের কর্মসূচিতে ব্যাপক সংখ্যক মহিলা অংশগ্রহণ করেছেন। জমিতে কাজ থাকার পরও বহু কৃষক ও চাষি আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। একটি বেসরকারি নার্সিং হোমের সামনে পুলিশ ব্যারিকেড দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন পবিত্র কর। তাঁর অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকার পিছনে দুরভিসন্ধি ছিল এবং পুলিশের উদ্দেশ্য ভালো ছিল না।
অন্যদিকে জিএমপি-র সাধারণ সম্পাদক রাধাচরণ দেববর্মা বলেন, গত কয়েক বছরের মধ্যে এই ধরনের কর্মসূচিতে এমন অভূতপূর্ব সাড়া আর দেখা যায়নি। আগরতলা থেকে শুরু করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে জুমিয়া, দিনমজুর, ক্ষেতমজুর, মহিলা, পুরুষ, ছাত্র-যুব, কৃষক ও চাষিরা ব্যাপকভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। রাধাচরণ দেববর্মার বক্তব্য, এডিসি এবং নন-এডিসি—উভয় এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যেই সরকারের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সরকারের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে মানুষ জেগে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ত্রিপুরা ক্ষেতমজুর ইউনিয়নের রাজ্য সম্পাদক শ্যামল দে দাবি করেন, এদিনের কর্মসূচিতে ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন। সমস্ত ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই মানুষ আন্দোলনে শামিল হয়েছেন বলে জানান তিনি।
শ্যামল দে বলেন, এদিনের কর্মসূচিতে গণশক্তির সংগ্রামী মেজাজ স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, সরকার যে ভাষা বোঝে, সেই ভাষাতেই জনতা নিজেদের প্রতিবাদের বার্তা বুঝিয়ে দিয়েছে। সিটু রাজ্য সভাপতি মানিক দে বলেন, এদিনের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যে আইনের শাসন তলানিতে পৌঁছেছে এবং দুর্নীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তবে আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেন মানিক দে। তিনি বলেন, এদিনের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও গণবিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। আগামী দিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি সংগঠিত করা হবে বলেও আগাম বার্তা দেন তিনি।
মানিক দে আরও বলেন, সরকার এই আন্দোলন থেকে শিক্ষা নেবে কিনা, সেটা সরকারের বিষয়। তবে সরকারের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দাবিগুলি পূরণের দাবি জানানো হয়েছে। আগামী দিনে সরকার পরিবর্তনের ডাক দেওয়া হবে বলেও ইঙ্গিত দেন সিটু রাজ্য সভাপতি। বাম নেতৃত্বের বক্তব্যে স্পষ্ট, এদিনের জেল ভরো আন্দোলনকে তারা শুধুমাত্র একটি কর্মসূচি হিসেবে দেখছে না। বরং রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের একটি বড় বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখছে তারা। আগামী দিনে এই আন্দোলন কোন পথে এগোয় এবং সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



