বর্তমান সরকার রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, গুণগত শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, জনজাতিদের বিকাশ, মহিলা ক্ষমতায়ন, সামাজিক কল্যাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানব সম্পদ উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করছে। গত ৭ বছরে এক শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ ত্রিপুরা গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ছাড়াও অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। আজ সকালে আসাম রাইফেলস ময়দানে ৭৯তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের মূল অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা) মানিক সাহা একথা বলেন। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে রাজ্যের জনগণের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ও বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্যে ত্রিপুরা এগিয়ে চলেছে। এগিয়ে চলার এই অভিমুখ আমাদের সুশাসনের নীতি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের মূল অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা) মানিক সাহা দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। মুখ্যমন্ত্রী ভারতীয় সেনাবাহিনীর বীর জওয়ানদের আন্তরিক অভিবাদন জানান যাঁরা পাকিস্তানের মদতপুষ্ট জঙ্গিদের দমনে সাফল্যের সঙ্গে ‘অপারেশন সিন্দুর’ পরিচালনা করেছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দূরদর্শী নেতৃত্বে সন্ত্রাসবাদ দমনে সাফল্যের সঙ্গে এই অভিযান এবং পাকিস্তানি হামলার যোগ্য জবাব যেভাবে সেনাবাহিনী দিয়েছে তাতে ভারতের বীর পরাক্রমকেই সূচিত করেছে।
আসাম রাইফেলস ময়দানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা) মানিক সাহা সম্মিলিত বাহিনীর কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন। কুচকাওয়াজে সিকিউরিটি ও ননসিকিউরিটি বিভাগে ১৬টি প্ল্যাটুন অংশগ্রহণ করে। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে রাজ্য পুলিশ বাহিনীর যে সমস্ত আধিকারিক ও কর্মীগণ কর্মক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য পদক পেয়েছেন তাদের পদক পরিয়ে দেন। অনুষ্ঠান শেষে বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তর, ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদ এবং যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের পরিচালনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা অংশ নেয়। আসাম রাইফেলস ময়দানে মূল অনুষ্ঠানে রাজ্যসভার সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য, ত্রিপুরা বিধানসভার উপাধ্যক্ষ রামপ্রসাদ পাল, মুখ্যসচিব জে. কে. সিনহা, পুলিশ মহানির্দেশক অনুরাগ সহ রাজ্য প্রশাসন ও আরক্ষা প্রশাসনের পদস্থ আধিকারিকগণ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন ‘আত্মনির্ভর ভারত’ শুধু সরকারি কার্যক্রম নয়, এটি হচ্ছে জন আন্দোলন। স্বদেশী ভাবনাকে বিশেষ গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিয়ে স্বদেশী সামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের দেশকে গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, স্টার্ট-আপ, গবেষণা এবং উৎপাদনে স্বদেশী চিন্তা-ভাবনাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা আমাদের রাজ্যেও ‘ভোকাল ফর লোকাল’ মন্ত্রকে পাথেয় করে স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশীয় পণ্যসামগ্রীগুলি যাতে বিশ্বের বাজারে স্বীকৃতি লাভ করতে পারে তার জন্য উৎপাদিত পণ্য সামগ্রীর গুণগতমান বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া আবশ্যক। আমাদের অগ্রাধিকার প্রযুক্তিনির্ভর আত্মনির্ভরশীল ভারত গড়ে তোলা। এখন সময় এসেছে, দেশের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে উদীয়মান ক্ষেত্রগুলিতে গুরুত্ব দেওয়া। আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, স্পেস এক্সপ্লোরেশন, বায়োটেকনোলজি ও রিনিউয়েবল এনার্জি’র উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ভারতকে বিশ্বের প্রথম সারিতে এগিয়ে যেতে হবে। এরজন্য আমরা আমাদের রাষ্ট্রীয় মন্ত্রে, ‘জয় জওয়ান, জয় কিষাণ, জয় বিজ্ঞান এবং জয় অনুসন্ধান’-কে যুক্ত করেছি। আত্মনির্ভরশীল ভারত গড়ার লক্ষ্যে আমরাও আমাদের রাজাকে ‘আত্মনির্ভরশীল ত্রিপুরা’ হিসাবে গড়ে তুলতে চাই।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বর্তমান সরকারের সময়ে রাজ্যে যেসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে তার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজ্যের জিএসডিপি ১২.৪৬ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটেছে। এরফলে জিএসডিপি-এর ক্ষেত্রে ত্রিপুরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজাগুলির মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। নীতি আয়োগের প্রকাশিত সূচকে ত্রিপুরা সারা দেশের মধ্যে ফ্রন্ট রানার রাজ্য হিসাবে উন্নীত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ইন্টিগ্রেটেড ক্রপ ম্যানেজমেন্ট কর্মসূচিতে ১৫ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দের মাধ্যমে ৯২ হাজার ৫৮৮ হেক্টর এলাকা ধান চাষের জন্য সম্প্রসারিত করা হয়েছে। ২০ হাজার ১৬১ হেক্টর এলাকা জৈবচাষের আওতায় আনা হয়েছে। ৫ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে প্রথমবারের মতো প্রাকৃতিক উপায়ে চাষাবাদ চালু করা হয়েছে। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে কৃষকদের মধ্যে ১১ হাজার ৪৪৪টি কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের বিশ্বংসী বন্যায় ২ লক্ষ ১৩ হাজারেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে ১০৯ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকার ত্রাণ হিসাবে সহায়তা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মাননিধি প্রকল্পে ২ লক্ষ ৩৮ হাজার কৃষকদের মধ্যে চলতি আগষ্ট পর্যন্ত প্রায় ২০১ কোটি টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যে কিষাণ ক্রেডিট কার্ড প্রকল্পে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা কৃষি ঋণ দেওয়া হয়েছে। ‘প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা’ যোজনায় ২৫ হাজার কৃষক নথিবদ্ধ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনার পরিপূরক হিসাবে ২০২০-২১ সালে চালু হওয়া মুখ্যমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনায় এখন পর্যন্ত ৩২ কোটি ৭৫ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা সহায়তা ও সাবসিডি হিসাবে প্রদান করা হয়েছে। ৩৬ হাজার ৬৬১টি সয়েল হেলথ কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের ২ হাজার ৮ হেক্টর এলাকায় পাম অয়েল চাষ হচ্ছে এবং এরফলে ১,৯৯১ জন কৃষক উপকৃত হচ্ছেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজ্যে প্রায় ২ লক্ষ ৪৭ হাজার ৩১০ টন দুধ, ৫৯ হাজার ৭০০ টন মাংস এবং প্রায় ৩৬ কোটি ডিমের উৎপাদন হয়েছে। মাথাপিছু ডিমের উপলব্ধতায় ত্রিপুরা উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজাগুলির মধ্যে শীর্ষ স্থানে এবং দুধ ও মাংসের উপলব্ধতায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজাগুলির মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে। মাছ উৎপাদনে বর্তমানে ত্রিপুরা উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং মৎস্য চাষে সর্বোত্তম পদ্ধতি গ্রহণের জন্য রাজ্যের মৎস্য দপ্তরকে কেন্দ্রীয় মৎস্য মন্ত্রক সম্মানিত করেছে।
মূলত মহিলা ক্ষমতায়ন, জীবিকা উন্নয়ন ও বন সংরক্ষণের লক্ষ্যে এলিমেন্ট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাঙ্কের সহায়তায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এই প্রকল্প চালু করা হয়। ৮২১টি গ্রামকে এই প্রকল্পের সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গত বছর রাজ্যের কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে ৩৩ হাজার ৩০৪ মেট্রিকটন ধান কেনা হয়েছে। ‘প্রধানমন্ত্রী গরীব কল্যাণ অন্ন যোজনায়’ প্রায়োরিটি হাউসহোল্ড এবং ‘অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনায়’ রেশন কার্ড হোল্ডারদের মধ্যে বিনামূল্যে মোট ১ লক্ষ ৫৯ হাজার মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। রাজ্যে আয়োজিত ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজেনস কনক্লেভ-২০২৫-এ ১২০ জন বিনিয়োগকারী অংশ নিয়েছিলেন। ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের জন্য ৮৭টি মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এবছর মে মাসে নয়াদিল্লীতে আয়োজিত রাইজিং নর্থ-ইস্ট সামিটে রাজ্যে ১৫ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা বিনিয়োগের জন্য ৬৪টি মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের আর্থিক সহায়তায় শিল্পাঞ্চলগুলির উন্নয়ন পরিকাঠামো জোরদার করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০টি নির্ধারিত ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি বর্ধিত করা হয়েছে। এর ফলে ২ লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক উপকৃত হয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা রাজ্যের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি মূল ভিত্তি। আমবাসা, কাকড়াবন এবং করবুকে তিনটি সরকারি মহাবিদ্যালয় স্থাপন করা হচ্ছে, যা আসন্ন শিক্ষাবর্ষ থেকে শুরু হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিকাঠামো বিকাশের লক্ষ্যে গন্ডাছড়া সরকারি মহাবিদ্যালয়ে ৫০ আসনবিশিষ্ট ছাত্রীদের হোস্টেল নির্মাণের কাজ চলছে। টি.আই.টি. এবং নরসিৎগড়ের ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটি-র জন্য নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। সারা দেশের মধ্যে ত্রিপুরা ইতিমধ্যেই তৃতীয় পূর্ণসাক্ষর রাজ্য হিসাবে ঘোষিত হয়েছে। রাজ্যে সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৯৫.৬ শতাংশ। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শুধুমাত্র ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজ্যের শহর এলাকায় ৪ হাজার ৭০০টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। গত ৫ বছরে ‘মুখ্যমন্ত্রী নগর উন্নয়ন প্রকল্পে’ মোট ১,৫০০ কোটি টাকা বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে। এরফলে ২০টি নগর এলাকায় ১৮ লক্ষ ৩০ হাজার শ্রমদিবসের সৃষ্টি হয়েছে এবং শহুরী পরিকাঠামো শক্তিশালী হয়েছে।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা) মানিক সাহা বলেন, বর্তমানে রাজ্যের গ্রামীণ মহিলাগণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দীনদয়াল অন্ত্যোদয় যোজনার মাধ্যমে ৫৩ হাজার ৬৯৪টি স্ব-সহায়ক দল গড়ে উঠেছে। এতে প্রায় ৪ লক্ষ ৮২ হাজার মহিলা যুক্ত রয়েছেন। তাদের ৭৭৯ কোটি টাকা কমিউনিটি ফান্ড হিসাবে সহায়তা করা হয়েছে। এরমধ্যে ২১ কোটি ১০ লক্ষ টাকা ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে বরাদ্দ করা হয়েছে। স্ব-সহায়ক দলগুলিকে ১,৬২২ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। বৈচিত্র্যময় জীবিকা নির্বাহ কর্মসূচির মাধ্যমে ১ লক্ষ ৮ হাজার ২৮১ জন মহিলা ‘লাখপতি দিদি’ হয়ে উঠেছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সাব্রুম পর্যন্ত রেল লাইনের বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন হয়েছে। ইলেকট্রিক পণ্যবাহী ট্রেনের ট্রায়াল রান সফল হয়েছে। শীঘ্রই বৈদ্যুতিক ট্রেনে যাত্রী পরিষেবা শুরু হবে। ‘অমৃত ভারত স্টেশন’ প্রকল্পে রাজ্যের প্রধান ৪টি রেল স্টেশন যথাক্রমে, আগরতলা, ধর্মনগর, কুমারঘাট এবং উদয়পুরের আধুনিকীকরণের কাজ চলছে। গন্ডাতুইসা, জোলাইবাড়ি, মনুবাজার, জিরানীয়া ও মেলাঘরে নতুন মোটরস্ট্যান্ড নির্মাণের কাজ চলছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২৫.৪ কিমি দীর্ঘ আমতলী কুঁড়ি পুকুর থেকে লেম্বুছড়া পর্যন্ত ওয়েস্টার্ণ বাইপাস সড়ককে চার লেনে রূপান্তর করা হচ্ছে। রাজ্যে সড়ক যোগাযোগ বাড়াতে আগামী বছরে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে বিদ্যুৎ পরিকাঠামো শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছে।
এশিয়ান ডেভেলাপমেন্ট ব্যাঙ্কের অর্থায়ণে ত্রিপুরা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন স্ট্রেংদেনিং অ্যান্ড জেনারেশন এফিশিয়েন্সি প্রজেক্টের অধীনে ২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা পেয়েছে। প্রকল্পের বিতরণ ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। শক্তিশালী বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে নর্থ ইস্টার্ন রিজিওনাল পাওয়ার সিস্টেম ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (NERPSIP) রূপায়ণ করা হচ্ছে, যা এখন শেষের পথে। পিএম-জনমন প্রকল্পের অধীনে ১১ হাজার ৬৯২ রিয়াং পরিবারের মধ্যে বিদ্যুতায়ন সফলতার সাথে সম্পন্ন হয়েছে। ‘পি-এম সূর্য ঘর মুফত বিজলী’ যোজনায় ৫৩৪টি বাড়ির ছাদে সৌর প্যানেল বসানো হয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে রাজ্য বিদ্যুৎ দপ্তর ন্যাশনাল এনার্জি কনজারভেশন পুরস্কার পেয়েছে। রাজ্যে গ্রামীণ এবং প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে ‘পিএম কুসুম প্রকল্পে’ সৌর বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ৫ হাজার ২৭৭টি নতুন সৌর পাম্প বসানো হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জল জীবন মিশনের অভূতপূর্ব সফলতার জন্য রাজ্যব্যাপী স্বচ্ছ পানীয় জলের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে যেখানে রাজোর গ্রামীণ এলাকায় ট্যাপের মাধ্যমে কেবলমাত্র ৩২৬ শতাংশ বাড়িতে পানীয় জলের ব্যবস্থা ছিল। এবছর জুলাই মাস পর্যন্ত রাজ্যের ৬ লক্ষ ৪৬ হাজার বাড়িতে পানীয় জলের সংযোগ পৌঁছে গেছে। শতকরা হার প্রায় ৮৬১১ শতাংশ। আমাদের লক্ষ্য মার্চ, ২০২৬ এর মধ্যে ১০০ শতাংশ বাড়িতে পানীয় জলের সংযোগ পৌঁছে দেওয়া। বর্তমানে রাজ্যের ৯৭.৪৯ শতাংশ বিদ্যালয় এবং অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে পানীয় জলের সংযোগ পৌঁছে গেছে। উদ্ভাবনী প্রকল্পে স্থানীয় ঝর্ণাগুলি ব্যবহার করে পাহাড়ী এলাকায় পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৩৪৮টি এধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, আরও ১৯৭টি প্রকল্পের কাজ চলছে।
ত্রিপুরা স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য পরিকাঠামো সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দিকে এগিয়ে চলেছে বলে অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে আগরতলা গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএসের আসন সংখ্যা বেড়ে ১৫০ হয়েছে। স্নাতকোত্তর কোর্সে রাজ্যে আসন সংখ্যা ৮৫টি। স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা কোর্সে ১০ টি আসন রয়েছে। আগরতলা গভর্নমেন্ট ডেন্টাল কলেজে ১৩টি আসন বাড়ানো হয়েছে, এর ফলে বর্তমানে আসন সংখ্যা ৫০ থেকে বেড়ে ৬৩ হয়েছে। আগরতলা গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও জিবিপি হাসপাতালে নতুন ২০০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশুদের জন্য হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবছর জানুয়ারি মাসে বিলোনীয়ায় মা ও শিশু হাসপাতালের উদ্বোধন করা হয়েছে। আগরতলার গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও জিবিপি হাসপাতালে ৩টি সফল কিডনি প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়েছে। নেশায় আসক্তদের জন্য সিপাহীজলায় সুসংহত পুনর্বাসন কেন্দ্রের কাজ শুরু হয়েছে। খোয়াই ও সিপাহীজলায় নতুন করে জেলা হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। সম্প্রতি টিপিএসসি’র পরীক্ষার মাধ্যমে ২১৬ জন জেনারেল ডিউটি মেডিক্যাল অফিসার (অ্যালোপ্যাথি) গ্রেড-৪ পদে উত্তীর্ণ হয়েছে। ৪৫ জন স্পেশালিস্টস মেডিক্যাল অফিসারের নিয়োগপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ২ জন সুপার স্পেশালিস্টসের নিযুক্তিকরণ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন টেকনিক্যাল এবং নার্সিং-এর বিভিন্ন পদে লোক নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে ৩৬৮ জন প্যারামেডিক্যাল স্টাফ, ৩০৮ জন মাল্টি টাস্কিং স্টাফ নিয়োগ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনায় এবছর জুলাই মাস পর্যন্ত রাজ্যের ৫ লক্ষ ৪৯ হাজার পরিবারের মোট ১৬ লক্ষ ১১ হাজার ৭৩৮ জন সুবিধাভোগীকে আয়ুষ্মান কার্ড ইসা করা হয়েছে।
‘চিফ মিনিস্টার জন আরোগ্য যোজনা-২০২৩’ প্রকল্পে এবছর জুলাই মাস পর্যন্ত রাজ্যের মোট ৫ লক্ষ ৪০ হাজার ৭৮৭ জনকে আয়ুষ্মান কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস করার ক্ষেত্রেও সারা দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। টিবিমুক্ত ভারত অভিযানের সফলতার স্বীকৃতি হিসাবে ২০২৫ জাতীয়ন্তরে ত্রিপুরা পুরস্কৃত হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ক্রীড়া পরিকাঠামো উন্নয়নে রাজো মোট ৮টি সিন্থেটিক টার্ফ নির্মিত হয়েছে। একটি নির্মাণের কাজ চলছে। এছাড়াও জনজাতি কল্যাণ দপ্তরের উদ্যোগে তিনটি এবং ধলাই জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আরও একটি সিন্থেটিক টার্ফ নির্মাণ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পর্যটন পরিকাঠামো উন্নয়নে রাজ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছে। ধর্মীয় পর্যটনকে উন্নত করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘প্রসাদ প্রকল্পে’ ৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে উদয়পুরে মাতা ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দিরের পুননির্মাণের কাজ শেষের পথে। ‘স্বদেশ দর্শন-২’ প্রকল্পে জিরানীয়ায় এস এন কলোনীতে হ্যারিটেজ ভিলেজ অ্যান্ড সংগীত এক্সপেরিয়েন্স স্থাপনের জন্য ৪৮ কোটি ৯৪ লক্ষ টাকা মঞ্জুর হয়েছে। উদয়পুরের বনদোয়ারে ৫১ শক্তিপীঠের রেপ্লিকা নির্মাণের জন্য ৯৭ কোটি টাকা মঞ্জুর হয়েছে এবং গত জুলাই মাসে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছে। এশিয়ান ডেভেলাপমেন্ট ব্যাঙ্কের আর্থিক সহায়তায় ১৭৯ কোটি ৭২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে কসবা কালিবাড়ি, চতুর্দশ দেবতাবাড়ি, কৈলাশহরের সোনামুখী ছবিমুড়া, অমরসাগর এবং ফটিক সাগরের উন্নয়নের কাজ চলছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরা ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার রুলস্, ২০২৫ প্রবর্তন এবং ‘স্বাগত প্ল্যাটফর্মের’ সাথে যুক্ত অনলাইন চ্যাঞ্জ অব ল্যান্ড ইউজ (CLU) সিঙ্গেল উইন্ডো পোর্টাল চালুর ফলে ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সহজতর হয়েছে। ঐতিহাসিক ভূমি বন্দোবস্ত রেকর্ড ডিজিটালাইজ হচ্ছে, যা স্বচ্ছতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ডাই-ইন-হারনেস সহ মোট ১৯ হাজার ৭৬৫ জনকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা হয়েছে। যুবশক্তির ক্ষমতায়নে ২৩টি চাকরি মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ৩,৮২৩ জন চাকরি প্রার্থী অংশগ্রহণ করেন। ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং-এ ১৮ হাজার ছাত্রছাত্রী যুক্ত হয়েছে। ‘অগ্নিবীর’ প্রকল্পে ৫৩টি সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে রাজোর ৭ হাজার ৭০০ জন যুবকযুবতী অংশগ্রহণ করে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, খোয়াই কোর্ট বিল্ডিংয়ের সম্প্রসারণের পাশাপাশি ধর্মনগর, উদয়পুর এবং সাব্রুমে নয়টি বিচার বিভাগীয়দের নতুন কোয়ার্টার নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এগারোটি নতুন রাজ্য আইন কার্যকর করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালে সাতটি জাতীয় পঞ্চায়েত পুরস্কার লাভ করে ত্রিপুরা একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেছে, যা ২.৫ লক্ষ গ্রামীণ স্থানীয় সংস্থার মধ্যে দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। ‘আমার সরকার’ পোর্টালের মাধ্যমে গ্রামীণ ২৫ হাজারেরও বেশি অভিযোগের ১১ শতাংশের সমাধান করেছে। ত্রিপুরা পঞ্চায়েত অ্যাডভান্সমেন্ট ইনডেক্সের জন্য জাতীয় পাইলট হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিল, যেখানে ৪২টি পঞ্চায়েত ‘এ’ গ্রেড অর্জন করেছে এবং বিকেন্দ্রীকরণ সূচকে সপ্তম স্থানে উঠে এসেছে। রাজ্যে এমজিএমএন রেগায় ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ১১০৭.৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩ কোটি ৫৩ লক্ষ শ্রমদিবস সৃষ্টি করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের জন্য ৩ কোটি ৫০ লক্ষ শ্রম দিবসের অনুমোদন করেছে। জুলাই মাস পর্যন্ত রাজ্যে ১ কোটি ৮ লক্ষ শ্রমদিবস সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় (গ্রামীণ) ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ২২ হাজার ৫৭৪টি ঘর নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। এর জন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫১ কোটি টাকা।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গ্রামোন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন (TRLM) জাতীয়ন্তরে বিভিন্ন পুরষ্কার পেয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: ক) ৭০৭ পলিসি লোন মডেল অ্যাওয়ার্ড (২০২৪) খ) ব্যাঙ্কসখী ফিনান্সিয়াল ইনক্লুশান মডেল অ্যাওয়ার্ড (২০২৫) গ) ধলাই জেলা ন্যাশনাল এসএইচজি ফেডারেশন অ্যাওয়ার্ড (২০২৪) ঘ) দক্ষিণ ত্রিপুরা রিজিওনাল অ্যাওয়ার্ড ফর কো-অপারেটিভ উইমেন ফেডারেশনস (২০২৪) ৩) ডিএওয়াই-এনআরএলএম জিপিপি র্যাঙ্কিং অ্যাওয়ার্ড। ত্রিপুরার পঞ্চায়েত রাজ ব্যবস্থা জাতীয়স্তরে ভূয়সী প্রশংসিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: ক) নানাজী দেশমুখ ন্যাশনাল জিপিপি র্যাঙ্কিং-এ গোমতী জেলা এবং অম্পিনগর রক শীর্ষ স্থান লাভ করেছে। খ) খোয়াই জেলা পঞ্চায়েত ‘গ্রাম উন্নয়ন বন্ধু’ বিশেষ জিপিপি পুরস্কার পেয়েছে। গ) রাজ্য পঞ্চায়েত দপ্তর ন্যাশনাল পঞ্চায়েতরাজ সিস্টেম রিকগনিশন পেয়েছে। দীনদয়াল উপাধ্যায় পঞ্চায়েত সতত বিকাশ পুরষ্কার, মহিলা বান্ধব পঞ্চায়েত ক্যাটাগরীতে প্রথম হয়েছেন দক্ষিণ মনুবনকুল ভিলেজ কমিটি, রূপাইগুড়ি। দারিদ্র মুক্ত পঞ্চায়েত বিভাগে তৃতীয় বেতছড়া গ্রাম পঞ্চায়েত, কুমারঘাট। শিশু বান্ধব পঞ্চায়েত বিভাগে তৃতীয় অমরপুরের রাজকাং ভিলেজ কমিটি। সারা দেশের মধ্যে গোমতী জেলা নানাজী দেশমুখ সর্বোত্তম পঞ্চায়েত সতত বিকাশে শ্রেষ্ঠ জেলার পুরস্কার পেয়েছে। এই ক্যাটাগরিতে অমরপুর ব্লক দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ব্লক হিসাবে পুরষ্কার লাভ করেছে। অমরপুর ব্লকের থাকছড়া গ্রাম পঞ্চায়েত গ্রাম উর্জা স্বরাজ বিশেষ পুরস্কার ক্যাটাগরীতে দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ পঞ্চায়েতের পুরস্কার লাভ করেছে। এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ কোটি টাকা। জিরানীয়া ব্লকের পশ্চিম মজলিশপুর গ্রাম পঞ্চায়েত ২০২৪-২৫ সালে ন্যাশনাল ই-গর্ভনেন্স পুরস্কার লাভ করেছে। সুশাসনের জন্য ধলাই জেলা বেস্ট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়ি অ্যাওয়ার্ড, সম্পূর্ণতা অভিযানে নীতি আয়োগের অ্যাওয়ার্ড অব অ্যাপ্রিসিয়েশন, গোমতী জেলা ও ধলাই জেলার গঙ্গানগর ব্লককে প্রাইম মিনিস্টার্স অ্যাওয়ার্ডস ফর এক্সিলেন্স টু পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে ৩১ হাজারেরও বেশি এসসি শিক্ষার্থী প্রি-ম্যাট্রিক এবং পোস্ট ম্যাট্রিক বৃত্তি পাচ্ছে। বোর্ডিং স্টাইপেন্ড, কোচিং এবং ৫০ হাজার টাকা এককালীন প্রদানের মাধ্যমে পেশাদার কোর্স করতে সহায়তা করা হচ্ছে। ওবিসিভুক্ত সুবিধাভোগীদের শিক্ষা, ব্যবসা ও পরিবহণের জন্য ১৬ জনকে প্রায় ১ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হয়েছিল।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের জনজাতিদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সামগ্রিক কল্যাণে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তর একযোগে কাজ করছে। অনেকগুলি এক্সটারনালি এইডেড প্রজেক্ট রয়েছে যার অধিকাংশই জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায়। জনজাতি জনগোষ্টীর সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ২রা অক্টোবর, ২০২৪ ধরতি আবা জনজাতীয় গ্রাম উৎকর্ষ অভিযান নামে একটি নতুন প্রকল্পের সূচনা করেন। এই প্রকল্পের অধিনে ত্রিপুরার ৫২টি ব্লকের ৩৯২টি গ্রামে বসবাসরত জনজাতিদের জন্য মৌলিক সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হবে। জনজাতি অধ্যুষিত ব্লকে যোগাযোগ, অর্থনৈতিক ও সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকার ত্রিপুরা রুরাল ইকোনমিক গ্রোথ অ্যান্ড সার্ভিস ডেলিভারি প্রজেক্ট (TRESP)” লোন এগ্রিমেন্ট ২০ মার্চ, ২০২৪ থেকে কার্যকর হয়। রাজোর জনজাতি সম্প্রদায়ের সমাজপতিদের জন্য সামাজিক ভাতা ২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।
বিশেষ অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্যাকেজের আওতায় ১ হাজার ৩১৬টি পরিবারকে আয় বৃদ্ধির জন্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ১০০টি মার্কেট স্টল নির্মাণ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর রাবার মিশনে ২৩, ১৬০ হেক্টর এলাকায় ২৯,৭৫৬ টি পরিবারকে সহায়তা করেছে। এবারের বাজেটে মেধাবী জনজাতি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর জনজাতি উন্নয়ন মিশনের অধীনে সুপার-১০০ প্রোগ্রাম চালু করা হবে। এবারের বাজেটের প্রতি পাতায় বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মৎস্য, পশুপালন, জনজাতি কল্যাণ সহ বিভিন্ন দপ্তরের উন্নয়নমূলক কর্মসূচি কোন না কোনভাবে জনজাতিদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বয়স্ক নাগরিক, কন্যা সন্তান এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিদের জন্য মোট ৮২৬ কোটি টাকা সামাজিক ভাতা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাজ্যের ৩ লক্ষ ৯০ হাজার সুবিধাভোগী উপকৃত হয়েছেন। ১১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কর্মরত মহিলাদের জন্য ১০টি হোস্টেল নির্মাণ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনা এবং মুখ্যমন্ত্রী মাত্রুপুষ্টি উপহার যোজনায় রাজ্যের ৪৮ হাজার মহিলা উপকৃত হয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ত্রিপুরা পুলিশ নিরন্তর কাজ করছে। এর ফলে সামগ্রিক অপরাধের ক্ষেত্রে ত্রিপুরা দেশের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে সর্বনিম্ন দিক থেকে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। রাজ্যে প্রতি লক্ষ জনসংখ্যায় সামগ্রিক অপরাধের হার ১১০টি মামলা, যেখানে জাতীয় গড় ৪২২টি মামলা। মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধে ত্রিপুরা ২৮টি রাজ্যের মধ্যে সর্বনিম্ন দিক থেকে অষ্টম স্থানে রয়েছে। প্রতি লক্ষ জনসংখ্যায় মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের হার ৩৭টি মামলা। সেখানে জাতীয় গড় ৬৬টি মামলা। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে সামগ্রিক অপরাধ ১৯.৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের প্রথম ৫ মাসে সামগ্রিক অপরাধের হার পুনরায় আরও ১২.৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মহিলা বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে প্রতিটি থানায় ২৪ X ৭ মহিলা হেল্প ডেক্স চালু রয়েছে। মহিলাদের সুরক্ষায় ১০৯১ মহিলা হেল্প লাইন চালু রয়েছে। বর্তমানে রাজ্যের প্রতিটি জেলায় একটি করে মোট ৯ টি মহিলা থানা রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাজ্য সরকার নেশামুক্ত ত্রিপুরার লক্ষ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে মাদক দ্রব্য বাজেয়াপ্ত করার পরিমাণ ১০৬% বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদক ধ্বংসের পরিমানও এই সময়ে ১৩২% বৃদ্ধি পেয়েছে। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যে ৫টি নতুন প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রকল্পগুলি হল মুখ্যমন্ত্রী শস্য শ্যামলা যোজনা, মুখ্যমন্ত্রী বালিকা সমৃদ্ধি যোজনা, চিফ মিনিস্টার স্কিম ফর মেন্টালি চ্যালেঞ্জ পার্সনস, মুখ্যমন্ত্রী কন্যা বিবাহ যোজনা, চিফ মিনিস্টার অ্যাসিস্টেন্স ফর ডটার সন অব আর্মি। সিআরপিএফ পার্সোনাল। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান। মুখ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন সবার অংশগ্রহণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিকশিত ভারত এবং এক ত্রিপুরা, শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।
আসাম রাইফেলস ময়দানে ৭৯তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের মূল অনুষ্ঠানে কুচকাওয়াজে সিকিউরিটি বিভাগে বি.এস.এফ, সি.আর.পি.এফ, আসাম রাইফেলস, টি.এস.আর, (পুরুষ ও মহিলা), মেঘালয় পুলিশ, ফরেস্ট গার্ড, ট্রাফিক পুলিশ, হোমগার্ড, ত্রিপুরা পুলিশ এবং নন-সিকিউরিটি বিভাগে এন.সি.সি. বয়েজ, এনসিসি গার্লস, গার্লস গাইড, এনএসএস, সিভিল ডিফেন্স ও আসাম রাইফেলস পাবলিক স্কুল অংশ নেয়। কুচকাওয়াজে সিকিউরিটি বিভাগে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে যথাক্রমে ১৫ নম্বর টি.এস.আর, মহিলা ব্যাটেলিয়ন, বি.এস.এফ, ও ১৪ নম্বর টি.এস.আর, পুরুষ ব্যাটেলিয়ন। নন-সিকিউরিটি বিভাগে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে যথাক্রমে আসাম রাইফেলস পাবলিক স্কুল, এনসিসি বয়েজ ও এনএসএস।