আগরতলার সুপারি বাগানস্থিত দশরথ দেববর্মণ স্মৃতি প্রেক্ষাগৃহে এক মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কল্যাণপুরিয়ান সামাজিক সংস্থার উদ্যোগে দ্বিতীয় ‘শিক্ষক দিবস উদযাপন-২০২৬’ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও উৎসাহ প্রদান করা হয়। ‘কল্যাণপুরিয়ান’ বলতে মূলত কল্যাণপুর আর ডি ব্লক এলাকার সেই সমস্ত মানুষকে বোঝানো হয়, যারা রুটি-রুজি, শিক্ষা, চাকরি, পেশা ও অন্যান্য প্রয়োজনে বর্তমানে আগরতলায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। নিজেদের শিকড়, মাতৃভূমি এবং কল্যাণপুরের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ককে অটুট রাখার লক্ষ্যেই গড়ে উঠেছে এই সামাজিক সংস্থা।
সংস্থার সাধারণ সম্পাদক রাজ্যের বরিষ্ঠ চিকিৎসক তথা সমাজকর্মী ডাঃ তাপস কুমার সরকার তাঁর বক্তব্যে বলেন, মাতৃভূমির স্মৃতি, পরিচিত পরিবেশ, কৈশোরের বেড়ে ওঠার স্বর্ণালী সময়, যৌবনের স্বপ্ন, পরিবার-প্রতিবেশীর আত্মিক সম্পর্ক এবং শিক্ষাঙ্গনে কাটানো দিনগুলি মানুষের জীবনে কখনও ভোলার নয়। তাঁর কথায়, সেই সময় হয়তো অনেক অভাব ছিল, কিন্তু অভিযোগ ছিল না। কল্যাণপুরের আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতিও সবসময় খুব ভালো ছিল না। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষায় বেড়ে উঠেছেন তাঁরা। তবে বিষয়, বৃত্তি, ভাষা, সাহিত্য থেকে শুরু করে জীবনের চলার পথের প্রকৃত শিক্ষা দিয়েছেন বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। ডাঃ সরকার আরও বলেন, একই পরিবেশ ও একাত্মতার মধ্যে বেড়ে ওঠা কল্যাণপুরিয়ানদের সামাজিক সংস্থা শিক্ষা, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের প্রতি সর্বোচ্চ যত্নশীল। শিক্ষক দিবসে শিক্ষাগুরুদের সংবর্ধনা ও শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যমে তাঁদের আশীর্বাদ লাভের যে প্রয়াস, তা অব্যাহত থাকবে। একইসঙ্গে কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও পুরস্কারের মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলার লক্ষ্যেও সংস্থা কাজ করে চলেছে।
সকাল ১১টায় ভারতরত্ন ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের প্রতিকৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান এবং প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং রাজ্যের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় অধ্যাপক সায়ক মুখার্জী। স্বাগত ভাষণে অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক, প্রাক্তন জনপ্রিয় শিক্ষক ও সমাজকর্মী নীলকান্ত সিংহ উপস্থিত অতিথি ও অভ্যাগতদের স্বাগত জানান। পাশাপাশি অনুষ্ঠানের গুরুত্ব এবং মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কেও বিস্তারিতভাবে সকলকে অবহিত করেন। সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ডাঃ তাপস কুমার সরকার তাঁর সম্পাদকীয় বক্তব্যে কল্যাণপুরিয়ান সামাজিক সংস্থার উদ্দেশ্য, কর্মকাণ্ড এবং ভবিষ্যৎ ভাবনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। সংস্থার উপদেষ্টা চেয়ারম্যান, প্রাক্তন বরিষ্ঠ শিক্ষক ও শিক্ষা অধিকর্তা সুবোধ দত্ত তাঁর বক্তব্যে মানবতা বিকাশের লক্ষ্যে সকলকে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধান বক্তা অধ্যাপক সায়ক মুখার্জী কল্যাণপুরিয়ানদের এই উদ্যোগের প্রতি সহমত প্রকাশ করেন। তিনি স্বামী বিবেকানন্দের প্রদর্শিত পথে চলার পাশাপাশি আত্মদর্শনের মাধ্যমে মানবিকতার বিকাশ ঘটানোর জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে সংস্থার পক্ষ থেকে মোট ১৬ জন বরিষ্ঠ শিক্ষক-শিক্ষিকাকে ‘শিক্ষাগুরু’ হিসেবে শ্রদ্ধা ও সম্মাননা প্রদান করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ৬ জন বরিষ্ঠ শিক্ষিকা এবং ১০ জন বরিষ্ঠ শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাদানের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের জীবন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মাননা প্রদান করা হয়। এর পাশাপাশি বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী মোট ৩১ জন শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা ও উৎসাহ পুরস্কার প্রদান করা হয়। এর মধ্যে মাধ্যমিকে ১৬ জন, উচ্চ মাধ্যমিকে ১০ জন এবং প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফলতার জন্য ৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। এছাড়াও বিশেষ কৃতিত্বের জন্য সম্মানিত করা হয় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ঋদ্ধিতা গোপকে। চিত্রাঙ্কনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ও জাতীয় পুরস্কার অর্জনের জন্য তাঁকে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়।
অন্যদিকে, সম্প্রতি চণ্ডীগড়ে আয়োজিত জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে অনূর্ধ্ব-১৩ বিভাগে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের মুকুট জয় করা ত্রিপুরার কৃতী দাবাড়ু আরাধ্যা দাসকেও সম্মানিত করা হয়। তাঁর সাফল্য ত্রিপুরার গৌরব বৃদ্ধি করেছে বলে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করা হয়। সম্মানিত ৩১ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে ২৫০০ টাকা করে প্রতীকী অর্থ পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই অর্থমূল্য পুরস্কার কল্যাণপুরিয়ান পরিবারের সদস্যরা তাঁদের পিতা-মাতা, পরিজন এবং বিভিন্ন সংস্থার নামে স্মৃতি ও মেধা পুরস্কার হিসেবে প্রদান করে থাকেন। পুরস্কারপ্রাপকদের মধ্যে কল্যাণপুর আর ডি ব্লক এলাকার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের মেধাবী নির্বাচিত ১৪ জন শিক্ষার্থী এবং আগরতলায় বসবাসকারী কল্যাণপুরিয়ান পরিবারের সন্তান ১৭ জন রয়েছেন। তাঁদের কল্যাণপুরের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হিসেবে উল্লেখ করে আগামী দিনেও তাঁদের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল কল্যাণপুরিয়ান সাংস্কৃতিক টিমের শিল্পীদের মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সমবেত নৃত্যে অংশ নেন মেধা পুরস্কারপ্রাপ্ত মান্না দেব এবং তাঁর ১১ সদস্যের দল। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় চ্যাম্পিয়ন এই দলটির পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। এছাড়াও মাইম এবং শ্রুতি নাটক পরিবেশন করা হয়। শ্রুতি নাটকের লেখক ও পরিচালক ছিলেন জয়ন্ত ভট্টাচার্য। প্রাচী ও আরাধ্যার গান, সুখেনের গিটারের লহরা, শান্তনুর সিন্থেসাইজার এবং সমবেত সংগীত অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
অনুষ্ঠানের অন্তিম লগ্নে যুগ্ম সম্পাদক সন্তোষ গোপের পরিচালনায় মজার ছলে ১০টি ‘অভিনন্দন পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। এই পর্বেও অনুষ্ঠানে হাসি-আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে বিশিষ্ট কল্যাণপুরিয়ান উপদেষ্টা ভাইস চেয়ারম্যান জহরলাল দে আগামী দিনের বিভিন্ন অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন। এরপর সংস্থার সভাপতি প্রদীপ কুমার দাস ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। সবশেষে সমবেত জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে কল্যাণপুরিয়ান সামাজিক সংস্থার দ্বিতীয় শিক্ষক দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং কৃতী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি নিজেদের শিকড় ও সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার বার্তাই উঠে আসে এদিনের অনুষ্ঠানে।



