আজ বাঙালী কর্ষক সমাজ ও শ্রমজীবি সমাজের পক্ষ থেকে রাজ্য ভিত্তিক সন্মেলন অনুষ্ঠিত হয় আমরা বাঙালী রাজ্য কার্যালয়ে। আজকের এই সন্মানের মূল উদ্দেশ্য হলো বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার এফ ডি আই এর মাধ্যমে যেমন ভারতে অবাধে বিদেশি কোম্পানি গুলো কে অবাধ ব্যবসা বাণিজ্য করার সুযোগ দেবার ফলে দেশীয় ছোট খাটো মাঝারি ব্যাবসা বাণিজ্য আজ সর্বত্র তলানিতে এসে ঠেকেছে। বিদেশি কোম্পানি ও আমাদের দেশের কর্পোরেট ব্যাবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার্থে কেন্দ্রীয় সরকার যতটুকু অগ্ৰণী ভূমিকা নিয়েছে ঠিক ততটুকু গুরুত্ব দেয়নি দেশের ছোট খাটো ও মাঝারি ব্যাবসা বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষার্থে কোন অগ্ৰণী ভূমিকা নেয়নি।যার ফলে অনলাইন ব্যাবসা ও শপিং মলের ব্যাবসা বাণিজ্য ফুলে ফেঁপে উঠলেও সাধারণ মানুষের অবস্থা দিন দিন ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়েছে।ভারত কৃষি প্রধান দেশ। ভারতের প্রায় সত্তর শতাংশ মানুষ এই কৃষির ওপর নির্ভর করে দশকের পর দশক ধরে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল। কিন্তু বর্তমানে সাধারণ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভর করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করতে পারছে না এবং দিন দিন কৃষি কাজে অবহেলা দেখাচ্ছে ক্ষতির সম্মুখীন হবার দরুন।যার ফলে রাজ্যে এবং বহিঃ রাজ্যের মানুষ কৃষি জমি ভরাট করে উচ্চ দামে বিক্রি করার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরফলে দিন দিন কৃষি জমি কমছে এবং অপরদিকে দিন দিন লোকসংখ্যা বেড়ে চলেছে। কিন্তু সরকার এই ব্যাপারে উদাসীন।এর মূল কারণ আমাদের দেশে কৃষিকে শিল্পের মর্যাদা দেওয়া হয়নি। শুধু শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষা করে গেছে।যার ফলে কর্ষক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত হয়ে আসছে এর দরুন বছরে হাজার হাজার কর্ষক ঋণে জর্জরিত হয়ে আত্মহত্যার পথে হাঁটছে। আবার কিছু কিছু মানুষ ভিন দেশে ও অন্যান্য রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে জীবন জীবিকার জন্য।অথচ আমাদের দেশের কতিপয় শিল্প পতিরা কৃষিজাত পণ্যকে কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি টাকা রোজগার করছে।আর প্রকৃত কর্ষক সমাজ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে চলেছে।এর মূল কারণ হলো কৃষিজাত সহায়ক পণ্য গুলো প্রস্তুত করে বহুজাতিক কোম্পানি গুলো।যার ফলে কৃষিকাজ সহায়ক পণ্য যেমন সার ঔষধ বীজ ও যন্ত্রপাতি এ গুলোর দাম অত্যধিক। তাছাড়া রয়েছে প্রতি ব্লকে ব্লকে সেচের ঘাটতি ও হিমঘরের অভাব।যার ফলে কৃষি উৎপাদিত ফসল মরশুম সময়ে সংগ্ৰহ করার ফলে সঠিক দাম পাচ্ছে না কর্ষকেরা।কারণ যেহেতু কৃষিজাত পণ্য কাঁচামাল ও হিমঘরের অভাবে ও আর্থিক দুর্বলতার কারণে সংরক্ষণ সাধারণ কর্ষকেরা করতে পারে না।আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বহুজাতিক কোম্পানি গুলো স্বল্পদামে কৃষিজাত পণ্য গুলো ক্রয় করে এগুলোকে শিল্পজাত বা প্যাকেট জাত প্রসেসিং করে উচ্চ দামে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করে যাচ্ছে। তাই বাঙালী কর্ষক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে কৃষিকে শিল্পের মর্যাদা দিয়ে কৃষিজাত পণ্য গুলো কে কাজে লাগিয়ে কর্ষক সমবায় সমিতি গঠন করে শিল্পজাত করলে কর্ষক সমাজ যখন লাভবান হবে তখন ভবিষ্যতে কৃষির প্রতি আগ্ৰহ দেখাবে। তার ফলে কৃষিকাজে যেমন অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে তেমনি দেশের কৃষি পণ্য রফতানি করতে পারবে।যার ফলে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে কিছুটা চাপ কমবে। তাই বাঙালী কর্ষক সমাজের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে অবিলম্বে কৃষিকে শিল্পের মর্যাদা দিয়ে কর্ষক সমবায় গঠন করে কর্ষকদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে হবে।
উল্লেখিত সমস্যা সমাধানে বাঙালী কর্ষক ও শ্রমজীবি সমাজের পক্ষ থেকে আমরা রাজ্য তথা দেশের কর্তৃপক্ষের নিকট কিছু প্রস্তাব/ দাবি রাখছি। সেগুলো হলো –
১) কৃষিকে শিল্পের মর্যাদা দিয়ে প্রতিটি কৃষি পণ্যের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
২) প্রতিটি ব্লকে হিমঘর স্থাপন করে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩) অনাবাদি জমি গুলোকে চাষাবাদের উপযোগী করে তোলার জন্য সর্বত্র জল সেচের আওতায় আনতে হবে।
৪) কৃষি সহায়ক পণ্য সার বীজ ঔষধ যন্ত্রপাতি এগুলোর সঠিক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
৫) ব্লকে ব্লকে রাবারের মতো কৃষিজাত কাঁচামাল গুলোকে কাজে লাগিয়ে শিল্প স্থাপন করে স্থানীয় বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে।
৬)সব ধরনের কৃষি ঋণ মুকুব ও সমস্ত ক্ষেত্রে কৃষি বীমা চালু করতে হবে।
৭)কর্ষকদের ট্রেনিং দিয়ে আধুনিক কৃষি ব্যাবস্থায় সুশিক্ষিত করে তুলতে হবে।
৮)রেগার মজুরি বৃদ্ধি করতে হবে।
৯) কৃষি সহায়ক ও কৃষিজাত পণ্য গুলো কে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
১০)৬০ বছর বয়সে সরকারি কর্মচারীদের মতো কর্ষক ও শ্রমজীবি পেনশশান স্কীম চালু করতে হবে।
১১) কর্পোরেটদের স্বার্থে রচিত শ্রমকোড বাতিল করে শ্রমিকদের স্বার্থে আইন প্রণয়ন করতে হবে।
১২) বর্তমানে ভারত আমেরিকার সাথে চুক্তি করে শুধু কর্পোরেটদের স্বার্থ কে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কৃষিতে অবাধ বিনোয়োগের ব্যবস্থা করে দিলে আগামীতে কর্ষক সমাজ নীল চাষের অবস্থায় পরিণত হবে।



