গোপেশ রায় , তেলিয়ামুড়া,
ফুলের সৌন্দর্য আর শিশুর নিষ্পাপ হাসি এই দুটি জিনিসের প্রতি মানুষের ভালোবাসা চিরন্তন। প্রকৃতির এই দুই অনুপম সৃষ্টির প্রতি মানুষের মমত্ববোধ যেন আমাদের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতির প্রতিচ্ছবি। তেলিয়ামুড়া শহরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবি নজরুল বিদ্যাভবন এই ভালোবাসাকেই বাস্তব রূপ দিয়েছে এক ব্যতিক্রমী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগের মাধ্যমে। বিদ্যালয়ের প্রবেশপথেই দাঁড়িয়ে আছেন বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের এক মর্মর মূর্তি, যিনি যেন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছেন। এই মূর্তির পাদদেশে গড়ে উঠেছে এক মনোরম বাগান, যা শুধু ফুলের সৌন্দর্যেই নয়, বরং শিক্ষার এক জীবন্ত পাঠশালায় পরিণত হয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা ও ছাত্র-ছাত্রীরা সম্মিলিতভাবে বছরের পর বছর ধরে এই বাগান গড়ে তুলেছেন। এখানে শীত ও গ্রীষ্মকালীন উভয় ঋতুর উপযোগী ফুল যেমন গাঁদা, রজনীগন্ধা, ডালিয়া, গুলদাউদা, সূর্যমুখী প্রভৃতি চাষ করা হয়। পাশাপাশি, চাষ করা হয় বিন, টমেটো, কাঁচালঙ্কা, ফুলকপি, বাঁধাকপি সহ নানা ধরনের শাকসবজি।বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রদীপ কুমার পাল ও আশুতোষ দেব এক সাক্ষাৎকারে জানান, “আমরা শিক্ষক-শিক্ষিকা ও ছাত্র-ছাত্রীরা মিলে এই বাগান গড়ে তুলেছি। এখানকার সবজিগুলো আমরা মিড ডে মিল-এ ব্যবহার করি। নিজের হাতে ফলানো খাবার খাওয়ার আনন্দই আলাদা। এই উদ্যোগ শুধু খাদ্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলে। তারা শিখছে কীভাবে মাটি, জল, আলো ও যত্নের মাধ্যমে একটি ছোট বীজকে পরিণত করা যায় এক পূর্ণাঙ্গ গাছে।
এই বাগানে শুধুমাত্র জৈব সার ব্যবহার করা হয়, যা পরিবেশের জন্য নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যসম্মত। রাসায়নিক সার বা কীটনাশক থেকে দূরে থেকে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করার এই শিক্ষা ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যতে আরও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।ফুলের সৌন্দর্য শুধু চোখ নয়, মনকেও প্রশান্ত করে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মনে করেন, প্রতিটি বাড়িতে যদি একটু জায়গা থাকে, তবে সেখানে একটি ছোট বাগান গড়ে তোলা উচিত। এতে যেমন পরিবেশ রক্ষা হয়, তেমনি মানসিক প্রশান্তিও আসে। বিদ্যালয়ের এই বাগান শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি একটি চেতনার প্রতীক যেখানে প্রকৃতি, শিক্ষা ও মানবিকতা একসূত্রে গাঁথা। শিশুরা এখান থেকে শিখছে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান, শিখছে নিজের হাতে কিছু গড়ে তোলার আনন্দ, আর শিখছে ভালোবাসা ফুলের, মাটির, জীবনের ।এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি আলোকবর্তিকা, যা অন্য বিদ্যালয় ও সমাজের জন্য অনুকরণীয়। কবি নজরুল বিদ্যাভবনের এই প্রচেষ্টা যেন আরও বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অনুপ্রাণিত করে, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে।



