বাসুদেব ভট্টাচার্যী খোয়াই ১৭ই জানুয়ারি..…শনিবার থেকে খোয়াইয়ে শুরু হলো টি জি টি এ এইচ বি রোড এর দুই দিনের রাজ্য পরিষদের সভা।যা চলবে রবিবার পর্য্যন্ত।সারা রাজ্যের বিভিন্ন মহকুমা থেকে একশ পন্চাশ জন প্রতিনিধি রাজ্য পরিষদের সভায় যোগ দান করেন। শনিবার সন্ধ্যায় সংগঠনের খোয়াই বিভাগীয় কার্য্যালয়ে শিক্ষক ভবন এ রাজ্য পরিষদের সভা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগে শনিবার বিকেলে কবিগুরু পার্কে অনুষ্ঠিত হয় প্রকাশ্য সমাবেশে।এই সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে কষ্টার্জিত অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ লড়াই সংগ্রাম গড়ে তোলার আহ্বান জানান সমস্ত নেতৃবৃন্দরা।এর আগে শিক্ষক ভবন প্রাঙ্গণে সমিতির পতাকা উত্তোলন করেন সংগঠনের সভাপতি পুলিন ত্রিপুরা।শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সমিতির নেতৃবৃন্দ ও প্রস্তুতি কমিটির কর্মকর্তারা।শহীদ স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন এবং শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান উপস্থিত সবাই। শনিবার বিকেলে প্রকাশ্য সমাবেশে বক্তব্য রাখেন টি জি টি এ এইচ বি রোড এর প্রাক্তন সভাপতি , রাজ্যের শিক্ষক কর্মচারী আন্দোলনের অতীত দিনের বর্ষীয়ান নেতা তথা বিধায়ক অশোক মিত্র, প্রস্তুতি কমিটির চেয়ারম্যান বিধায়ক নির্মল বিশ্বাস,টি জি টি এ এইচ বি রোড এর সাধারণ সম্পাদক আশীষ চৌধুরী, খোয়াই বিভাগীয় সম্পাদক দুলাল আচার্য্য ও টি ই সি সি এইচ বি রোড এর খোয়াই বিভাগীয় সহ সম্পাদক সঞ্জীব ভট্যাচার্য্য। উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতি ছিলেন সমিতির সভাপতি পুলিন ত্রিপুরা
প্রকাশ্য সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে অশোক মিত্র বলেন, সূদূর অতীত দিনের অনেক লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা সংগঠন টি জি টি এ এইচ বি রোড আজ সারা রাজ্যের একটি লড়াকু ঐতিহাসিক সংগঠন।এই সংগঠন শুধুমাত্র শিক্ষকদের পেশাগত দাবী নিয়েই লড়াই করেনা।সারা রাজ্যের মেহনতী মানুষের দাবীতেও লড়াই করে।এই রাজ্যের শিক্ষক কর্মচারীদের আন্দোলনের একটা গৌরবোজ্বল ইতিহাস রয়েছে।এই লড়াই সংগ্রামে সুখময় সেনগুপ্তের মুখ্যমন্ত্রীত্বে অতীত দিনের কংগ্রেসী জমানায় শিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যে অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন।রুল ফাইভের মতো কুখ্যাত কালাকানুনে চাকুরি হারিয়েছেন।অনেকে দূর দূরান্তে আক্রোশমূলক বদলীর শিকার ও হয়েছেন।১৯৭৫ সালে তেরো দিনের লাগাতার ধর্মঘট সারা রাজ্যের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভিতকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত ও আন্দোলিত করেছে।শিক্ষক কর্মচারীদের প্রতি তৎকালীন সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে, বেতন পরিকাঠামোর পুনর্বিন্যাসসহ রাজ্যের অনিয়মিত শিক্ষক কর্মচারীদের নিয়মিতকরণের দাবীতে ছিল এই লাগাতার ধর্মঘট।সরকার দমণ ও পীড়ন করে আন্দোলনকে দাবিয়ে রাখতে সচেষ্ট ছিল।কুখ্যাত সেই মিসা আইন প্রয়োগ করে নেতাদেরকে জেলে পুরেছিল। আন্দোলন কারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছিল আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে।এরপরেও রাজ্যের লড়াকু শিক্ষক কর্মচারীরা পিছু হটেনি।অতীত দিনের এই গৌরবোজ্বল ইতিহাসকে অক্ষুণ্ণ রেখে শনিবার টি জি টি এ এইচ বি রোড ও টি ই সি সি এইচ বি রোড এর মতো সংগঠন পেশাগত দাবীসহ রাজ্যের শ্রমিক শিক্ষক কর্মচারী সহ সর্বস্তরের শ্রমজীবী মানুষের জীবন জীবিকা ও রুটি রুজির আন্দোলন জারি রেখে ক্রমেই সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।অশোক মিত্র বলেন ১৯৭৭ সালে প্রবাদপ্রতিম জননেতা নৃপেন চক্রবর্তীর নেতৃত্বে রাজ্যে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার আসীন হওয়ার পর থেকেই শিক্ষক কর্মচারীদের পেশাগত নায্য দাবী দাওয়া পূরণে সরকার কাজ শুরু করে।নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর একটির পর একটি পে কমিশন গঠিত হয়।বেতন ভাতা বাড়তে থাকে।শিক্ষক কর্মচারীরা অধিকার ভোগ করতে শুরু করে।বছরে দুই বার করে ডি এ প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়।আর আজ ডাবল ইঞ্জিন সরকারের সময় শিক্ষক কর্মচারীরা বঞ্চনার শিকার।ডি এর পরিমাণ আজ অর্ধেক করে দিয়েছে বর্তমান সরকার। বাইশ শতাংশ ডি এ আজও বকেয়া।শিক্ষক কর্মচারীদের বিভ্রান্ত করতে ২০১৮সালে প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিয়েছিল বিজেপি দল।যা আজ বাস্তবের মাটি স্পর্শ করতে পারেনি গত আট বছরেও।সর্বশিক্ষার শিক্ষকদের নিয়মিত করা হচ্ছে না।১০,৩২৩ এর কর্মচ্যুত শিক্ষক শিক্ষিকাদের চাকুরি ফিরিয়ে দেওয়া হলো না।অনিয়মিতদের নিয়মিতকরণে কোন ধরনের উদ্যোগ নেই।আদালতের রায় পর্য্যন্ত লঙ্ঘন করছে বিজেপি সরকার।সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে সরকার সর্বশিক্ষার শিক্ষকদের চাকুরি বাতিলের দাবিতে সওয়াল করছে।নতুন করে আমদানি করছে আউটসোর্সিং প্রথা।যেখানে নিয়োগ প্রাপ্তদের জীবন জীবিকার কোন পেশাগত নিরাপত্তা নেই।এন জি ওর মর্জির হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বেকারদের ভবিষ্যত।শিক্ষক কর্মচারীদের কষ্টার্জিত অধিকার হরণ করার খেলায় মেতে উঠেছে সরকার। তিনি বলেন সর্বত্র মানুষের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছে।মানুষ রাস্তায় নেমে এসে লড়াই সংগ্রামে সোচ্চার হচ্ছেন।শিক্ষক কর্মচারীদের ওপরেও সরকারের দমণপীড়নের শেষ নেই।হামলা আক্রমণের শিকার ওরাও।সরকার প্রমাদ গুণছে।আবারো ১৯৭৫ সালের মতো রাজ্যে শিক্ষক কর্মচারীরা জোরদার আন্দোলনের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়বে কিনা এ নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরে ভীতির সঞ্চার হয়েছে।অশোক মিত্র বলেন, রাজ্যে যে অবস্থা সারা দেশেও একই অবস্থা।জাতীয় সড়ক আজ মরণফাঁদের চেহারায় রুপান্তরিত হয়েছে।বেকারদের চাকুরি নেই।চাকুরির দাবী করতে গেলে পুলিশের মার খেতে হয়।শ্রম আইন বাতিল করে মোদির সরকার দানবীয় শ্রমকোড লাগু করে শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার হরণ করে নিয়েছে।মোদির সরকার আজ নিয়ন্ত্রণ করছে কর্পোরেটরা।সংবিধান পরিবর্তন করে নিজেদের একদলীয় শাসন জারি রাখতে মরীয়া হয়ে উঠেছে কেন্দ্রের সরকার।একশো দিনের কাজের প্রকল্প বাতিল করে দিয়েছে। বর্তমানে দেশের সভ্যতা সংস্কৃতিকে পদদলিত করছে।ইতিহাসকে বিকৃত করছে।গরীব মানুষ যাতে তার অভাব অনটনের যন্ত্রনা ভুলে যায় , রুটি রুজির আন্দোলন যাতে সংগঠিত না হয় তার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে সরকার।তিনি এও বলেন, এই অবস্থায় আমাদের কষ্টার্জিত অধিকার রক্ষায় মাথা উঁচু করে, বুক চিতিয়ে, সাহসে ভর করে ভয়ভীতিকে তুচ্ছ করে ঐক্যবদ্ধ লড়াই সংগ্রাম গড়ে তোলা ছাড়া আর কোন বিকল্প পথ নেই।
এই দিন প্রকাশ্য সমাবেশে বিধায়ক নির্মল বিশ্বাস বলেন, বিজেপি বিভাজনের রাজনীতিতে সক্রিয়।গণ আন্দোলনের শক্তিকে ভোঁতা করে দেওয়ার জন্য জাতপাত, ধর্ম বর্ণের ভিত্তিতে গরীব শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যকে দুর্বল করে দিয়ে ওরা ওদের অপশাসন টিকিয়ে রাখতে চায়।ছাত্র ছাত্রীদের পাঠক্রমের মধ্যেও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে।স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান ইতিহাসকেও কলঙ্কিত করছে ওরা।ভিশন ডকুমেন্টের কথা বলে সরকারে এসে ২৯৯টি প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে বসে আছে।রাজ্যে শিক্ষক কর্মচারীদের ভয়াবহ সঙ্কট চলছে।এরপরেও নিয়োগনিতি নেই।শিক্ষক কর্মচারীদের নায্য দাবী দাওয়া পূরণেও আগ্রহী নয় সরকার।ডি এ নিয়ে শিক্ষক কর্মচারীদের ভাঁওতাবাজি দিয়ে চলছে।লাগাতার কুৎসা আর মিথ্যাচারে পরিপূর্ণ অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বামফ্রন্ট আর সি পি আই এম এর বিরুদ্ধে।বলা হচ্ছে সি পি আই এম নাকি রাজ্যে সন্ত্রাসবাদীদের মদতদাতা।এই দলই নাকি রাজ্যে অতীত দিনে সন্ত্রাসবাদীদের দিয়ে হত্যালীলা সংগঠিত করেছে।আমরা চ্যালেঞ্জ করছি যে, আপনারাই তো সরকারে আছেন।রাজ্যেও আপনারা।কেন্দ্রেও আপনারা।আমরা যদি সন্ত্রাসবাদীদের মদত দিয়ে হত্যালীলা সংগঠিত করেই থাকি তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নিন।সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সবকিছু মানুষের সামনে উন্মুক্ত করুন।তা না করে কেন লাগাতার কুৎসা আর মিথ্যাচার করছেন!কিন্তু এদের সেই সাহস নেই।কারণ রাজ্যের মানুষ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ।মানুষ দেখেছেন সন্ত্রাসবাদীদের হাতে রক্ত ঝরেছে বামপন্থী সংগঠনের নেতা কর্মীদেরই।প্রকাশ্য সভায় আশীষ চৌধুরী বলেন, আমাদের সমিতির গণতান্ত্রিক কর্মসূচিকে সহ্য করতে পারছে না সরকার।তাই আমরা গণতান্ত্রিক কর্মসূচি করতে গেলে পুলিশ আর প্রশাসনের অনুমতি মিলে না।শিক্ষাঙ্গনে আজ শিক্ষক আক্রান্ত হচ্ছেন।রাজ্যে আজ শিক্ষক খুন হয়ে যাচ্ছেন।দূর দূরান্তে আক্রোশমূলক বদলীর শিকার হতে হচ্ছে।এই জনসমাবেশ থেকে নেতৃত্বরা সবার প্রতি আহ্বান জানান যে আগামী দিন কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে কষ্টার্জিত অধিকার আদায়ের স্বার্থে।



